Jun 08, 2026 1 min read read 177 views
গত এক সপ্তাহে সংবাদপত্র, টেলিভিশন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুললেই বারবার কয়েকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে।
একজন শিক্ষিত ছেলে-মেয়ের মা, নিজের ঘরে মৃত্যুর পর অনেক দিন পড়ে ছিলেন।
একজন প্রবাসী স্বামীর স্ত্রী ও সন্তানের মা, একা মৃত্যুবরণ করেছেন, কেউ খোঁজও নেয়নি।
একজন উচ্চপদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তা, জীবনের শেষ মুহূর্তে ছিলেন সম্পূর্ণ একা।
ঘটনাগুলো আলাদা হলেও তাদের মধ্যে একটি ভয়ংকর মিল আছে।
একাকিত্ব।
আমরা কি বুঝতে পারছি, আমাদের সমাজে নীরবে একটি মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে?
আগে মানুষ দরিদ্র ছিল, কিন্তু একা ছিল না।
এখন মানুষ শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল, কিন্তু অনেকেই গভীরভাবে নিঃসঙ্গ।
আমরা এমন এক সমাজ তৈরি করছি যেখানে সন্তানের রেজাল্ট জানা হয়, কিন্তু তার হৃদয়ের খবর নেওয়া হয় না।
মায়ের জন্য দামি ফোন কেনা হয়, কিন্তু প্রতিদিন পাঁচ মিনিট কথা বলা হয় না।
বাবার জন্য ভালো হাসপাতালের ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু তাঁর পাশে বসে গল্প করার সময় থাকে না।
আমাদের শৈশবটা অন্যরকম ছিল।
বাবা হয়তো চাকরির কারণে বাইরে থাকতেন, কিন্তু নানা, নানি, মামা, খালা, চাচা, ফুফু, প্রতিবেশী সবাই মিলে একটি নিরাপত্তার বলয় তৈরি করতেন।
একজন শিশুকে শুধু তার বাবা-মা নয়, পুরো সমাজ বড় করত।
আজ আমরা উঁচু দেয়ালের ফ্ল্যাটে থাকি, কিন্তু পাশের বাসার মানুষের নামও জানি না।
হাজার ফেসবুক বন্ধু আছে, কিন্তু বিপদের সময় দরজায় কড়া নাড়ার মতো একজন মানুষও নেই।
সবাই ব্যস্ত।
সবাই দৌড়াচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোথায় যাচ্ছি?
যদি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আমাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ না থাকে, তাহলে এই দৌড়ের অর্থ কী?
আমি চাই আমার সন্তান ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা হোক।
কিন্তু তার চেয়েও বেশি চাই সে একজন মানুষ হোক।
যে বৃদ্ধ মা-বাবার খোঁজ নেবে।
যে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে।
যে প্রতিবেশীর দুঃখে পাশে দাঁড়াবে।
যে বুঝবে, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়, ভালোবাসা এবং উপস্থিতি।
কারণ আমার সন্তান যদি পৃথিবীর সবচেয়ে শিক্ষিত মানুষও হয়, কিন্তু আমার জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পরে আমাকে ভুলে যায়, তাহলে একজন অভিভাবক হিসেবে আমার শিক্ষাদান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আমরা কী করতে পারি?
১. প্রতিদিন বাবা-মায়ের সাথে কথা বলুন
একই বাসায় থাকলেও অন্তত ১৫ মিনিট শুধু গল্প করার সময় রাখুন।
২. সপ্তাহে একদিন আত্মীয়দের খোঁজ নিন
একটি ফোন কল অনেক সময় একটি জীবন বাঁচাতে পারে।
৩. প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুন
অন্তত জানুন, পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকেন, একা থাকেন কিনা।
৪. সন্তানকে শুধু সফল নয়, সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন।পারলে ৪ টা থেকে ৭ টা বা এর অধিক সন্তান নিন 😄।সিরিয়াসলি।
বইয়ের শিক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি মানবিক শিক্ষাও জরুরি।
৫. একা থাকা বয়স্ক মানুষদের নিয়মিত খোঁজ নিন
আপনার এলাকার একজন বৃদ্ধ মানুষের খবর নেওয়ার দায়িত্ব নিন।
৬. পারিবারিক সময়কে অগ্রাধিকার দিন
মোবাইলের স্ক্রিন টাইম কমিয়ে পরিবারের সাথে বসুন, গল্প করুন, একসাথে খাবার খান।
৭. সমাজে "খোঁজ নেওয়ার সংস্কৃতি" ফিরিয়ে আনুন
দুই দিন কাউকে না দেখলে একটি বার্তা পাঠান, ফোন করুন, দরজায় কড়া নাড়ুন।
শেষ কথা
মানুষ ক্ষুধায় যেমন মারা যায়, তেমনি অবহেলা ও নিঃসঙ্গতাতেও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে।
ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো অর্থনৈতিক নয়, প্রযুক্তিগতও নয়।
হতে পারে সেটি হবে মানবিক সম্পর্কের সংকট।
চলুন আমরা এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলি, যারা শুধু ডিগ্রি অর্জন করবে না, মানুষের পাশে দাঁড়াতেও শিখবে।
কারণ জীবনের শেষ মুহূর্তে মানুষ তার ব্যাংক ব্যালেন্স, পদবি বা সার্টিফিকেট খোঁজে না।
সে খোঁজে একটি পরিচিত মুখ, একটি আন্তরিক কণ্ঠস্বর, আর একজন মানুষ, যে বলবে—
"আপনি একা নন, আমি আছি।"